প্লাস্টিড কাকে বলে? প্লাস্টিডের গঠন ও কাজ কি?

আজকে আমাদের প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে প্লাস্টিড অর্থ্যাৎ প্লাস্টিড কাকে বলে এবং উক্ত প্লাস্টিডের গঠন ও কাজ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। আশা করছি আপনাদের ভালো লাগবে।

প্লাস্টিড কাকে বলে

উদ্ভিদ কোষের সবচেয়ে বড় অঙ্গানু যা উদ্ভিদের জন্য খাদ্য প্রস্তুত, সঞ্চয় ও পরাগায়নে সাহায্য করে, তাকে প্লাস্টিড বলে।

অথবা উদ্ভিদকোষের সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত রঞ্জক বিহীন বা রঞ্জকযুক্ত বিশেষ বিপাকীয় অঙ্গানুকে প্লাস্টিড বলে।

প্লাস্টিড কাকে বলে

  চিত্রঃ প্লাস্টিড কাকে বলে

প্লাস্টিড উদ্ভিদ কোষের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, নীলাভ সবুজ শৈবাল প্রভৃতি উদ্ভিদ ছাড়া অন্য সব ধরনের উদ্ভিদের কোষে প্লাস্টিড থাকে।

বিভিন্ন উদ্ভিদে এদের আকৃতি বিভিন্ন ধরনের হয় এবং ভিন্ন ভিন্ন কোষে এরা ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যায় থাকে।

শৈবাল কোষে সাধারণত একটি এবং অন্যান্য উদ্ভিদ কোষে একাধিক প্লাস্টিড থাকে।

প্লাস্টিড জালিকাকার, সর্পিলাকার, রাশিযুক্ত, চাকতির মত, লাটিমের মত প্রভৃতি আকৃতির হয়।

আরও পড়ুন: নিউক্লিয়াস কি? আবিস্কারক কে?  নিউক্লিয়াস এর গঠন ও কাজ

আরও পড়ুন: শ্বসন কাকে বলে? শ্বসন কত প্রকার ও কি কি এবং এর প্রভাবক সমূহ কি কি?

আরও পড়ুন: চোখ কি? চোখের বিভিন্ন অংশের গঠন ও কাজ

প্লাস্টিড এর আবিষ্কারক কে ?

১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে শিম্পার (Schimper, ১৮৫৬-১৯০১) সর্বপ্রথম উদ্ভিদকোষে সবুজবর্ণের প্লাস্টিড লক্ষ করেন এবং এর নামকরণ করেন ক্লোরোপ্লাস্ট। পরবর্তীকালে অন্যান্য প্লাস্টিড আবিষ্কৃত হয়েছে।

উপরে আপনারা প্লাস্টিড কাকে বলে এবং এর আবিষ্কারক সম্পর্কে জেনেছেন। এখন এর প্রকার নিয়ে জানবো।

প্লাস্টিড কাকে বলে এবং প্রকারভেদ কি কি ?

বর্ণের তারতম্য অনুসারে প্লাস্টিডের শ্রেণীবিভাগ মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-

১. লিউকোপ্লাস্ট

২. ক্রোমোপ্লাস্ট

৩. ক্লোরোপ্লাস্ট।

১. লিউকো প্লাস্টিড কাকে বলে

লিউকোপ্লাস্ট একধরনের রঞ্জকবিহীন প্লাস্টিড যার সাধারণত কোনো বর্ণ নেই এবং এটি উদ্ভিদের বিভিন্ন বিপাকীয় কাজে অংশ নেয় । এদেরকেই মূলত লিউকোপ্লাস্ট বলে।

এদের কোনো বর্ণ বা রঙ নেই । এদের আকার অনেকটা দন্ডাকার বা গোলাকার ধরনের হতে পারে।

ভ্রুণীয়কোষ এবং যেসব কোষে কখনো কোনো প্রকার সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না সেই সকল কোষে লিউকোপ্লাস্ট অবস্থান করে। সূর্যের আলো পৌঁছালে লিউকোপ্লাস্ট ক্লোরোপ্লাস্টে পরিনত হতে পারে।

এদের প্রধান কাজ বিভিন্ন উদ্ভিদ অঙ্গের যে তরল খাদ্যবস্তু থাকে সেগুলোকে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চিত খাদ্য বস্তুতে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে। যেমনঃ শর্করা, চর্বি, প্রোটিন ইত্যাদি। এই ধরনের প্লাস্টিডে ল্যামেলিয় অংশ স্তরীভূত হয়ে থাকতে পারে না।

২. ক্রোমো প্লাস্টিড কাকে বলে

এরা অসবুজ রঙিন প্লাস্টিড , সবুজ রঙ ব্যাতীত অন্য যেকোনো রঙের হতে পারে এবং এরা উদ্ভিদের নানা ধরনের কাজে সাহায্য করে থাকে তাদেরকে ক্রোমোপ্লাস্ট বলে। এরা হলুদ বা কমলা রঙের প্লাস্টিড।

ক্রোমোপ্লাস্টে কমলা রঙের জন্য দায়ী ক্যারোটিন রঞ্জক এবং হলুদ রংয়ের জন্য জ্যান্থোফিল রঞ্জক থাকে।

এদের আকৃ্তি সাধারনত গোলাকার, লম্বা বা তারকাকার প্রভৃতি ধরনের হতে পারে। এরা তৈরী হয় প্রো-প্লাস্টিড থেকে । এরা উদ্ভিদের ফুল, ফল, পাতা প্রভৃতি বিভিন্ন অঙ্গকে রঞ্জিত করে এবং আকর্ষনীয় করে তুলে। ফলে কীট পতজ্ঞ আকৃষ্ট হয় অধিক। কিন্তু এরা সালোকসংশ্লেষন প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেয় না।

৩. ক্লোরো প্লাস্টিড কাকে বলে

একধরনের সবুজ রংয়ের প্লাস্টিড, অধিক ক্লোরোফিল যুক্ত, এবং এরা সালোকসংশ্লেষন প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নিতে পারে তাদের ক্লোরোপ্লাস্ট বলে।

ক্লোরোপ্লাস্ট সবুজ রঞ্জক যুক্ত ক্লোরোফিল এবং কমলা রঞ্জক যুক্ত ক্যারোটিন থাকে। এটি মূলত ক্লোরোফিল-a, ক্লোরোফিল-b, এবং জ্যান্থোফিলের সমন্বয়ে গঠিত।

উদ্ভিদের সবুজ পাতা, কচি কান্ড, কাঁচা ফল ইত্যাদির কোষে প্রচুর পরিমাণে ক্লোরোপ্লাস্টের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।সাধারনত নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদকোষে সংখ্যায় কম অর্থ্যাৎ (১-৫টি) এবং উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদকোষে অধিক সংখ্যায় ক্লোরোপ্লাস্ট দেখা যায়।

ক্লোরোপ্লাস্টের আকৃতি ও সংখ্যা:

এরা দেখতে অনেকটা চ্যাপ্টা, ডিম্বাকার, গোলাকার, ফিতার মতো, কাপের মতো প্রভৃতি আকৃতির হতে পারে।স্পাইরোগাইরা, ক্ল্যামাইডোমোনাস প্রভৃতি শৈবালে প্রতি কোষে একটি করে ক্লোরোপ্লাস্ট থাকে। উন্নত শ্রেনীর উদ্ভিদের পাতার কোষে এদের সংখ্যা অধিক সাধারণত 30 থেকে 50 পর্যন্ত হতে পারে।

ক্লোরোপ্লাস্টের গঠন:

প্লাস্টিড

               চিত্রঃ প্লাস্টিড কাকে বলে

ক্লোরোপ্লাস্টের গঠন স্বভাবতই বেশ জটিল ধরনের হয়ে থাকে। ক্লোরোপ্লাস্ট দুই প্রাচীর বিশিষ্ট হয়ে থাকে অর্থ্যাৎ এর প্রাচীর দুই টি । ক্লোরোপ্লাস্টের বাইরের দিকের যেই স্তর তাকে বহিঃস্তর এবং ভিতরের দিকের যেই স্তর তাকে অন্তঃস্তর বলে । নীচে ক্লোরোপ্লাস্টের গঠন বর্ণনা করা হলো-

স্ট্রোমা:ক্লোরোপ্লাস্টটি মূলত ঝিল্লি বেস্টিত এবং এর ভেতরের দিকে অবস্থিত স্বচ্ছ, দানাদার ও অসবুজ জলীয় ধরনের যেই পদার্থ থাকে তার নাম স্ট্রোমা । ক্লোরোপ্লাস্ট টি মূলত লাইপোপ্রোটিন ও এনজাইম দ্বারা নির্মিত।এতে ৭০S রাইবোজোম এর উপস্থিত থাকে।স্ট্রোমাতে গ্লুকোজ তৈরির এনজাইম রয়েছে ।

থাইলাকয়েড: ক্লোরোপ্লাস্টের স্ট্রোমার ভেতরে অবস্থিত ক্লোরোফিল বহনকারী এবং একক ঝিল্লিযুক্ত অনেকগুলো চ্যাপ্টা থলির মত অংশ থাকে। এদেরকে থাইলাকয়েড বলে।

এই রকম ১০ থেকে ১০০ টি থাইলাকয়েড স্তরে স্তরে একটি চক্র গঠন করে একে গ্রানা বলে । প্রতিটি ক্লোরোপ্লাস্টে মোট ৪০ থেকে ৬০ টি গ্রানা থাকে ।

DNA ও রাইবোজোম: ক্লোরোপ্লাস্টের মধ্যে প্রায় সমান আকৃতির ২০০ টির মত DNA অনু দেখা যায়।

এগুলো হলো ক্লোরোপ্লাস্টের নিজস্ব DNA যা কোষের কোনোরকম কোনো কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে না।

এটি শুধু ক্লোরোপ্লাস্টের বিভাজন বা উৎপাদনে অংশ গ্রহন করে।

একই ভাবে ক্লোরোপ্লাস্টেও ৭০S রাইবোজম পাওয়া যায় যা কোষের কার্যক্রমে অংশ নেয় না। এটি ক্লোরোপ্লাস্টের নিজস্ব প্রোটিন উৎপাদনে অংশ নেয়।

প্লাস্টিড কাকে বলে

প্লাস্টিড এবং ক্লোরোপ্লাস্ট এর কাজ:

১. সৌরশক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে (ATP, NADP) রূপান্তরিত করে।

২.  সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানির সাহায্যে শর্করা জাতীয় খাদ্য  তৈরী করতে পারে।

৩. সূর্যালোকের সাহায্যে ফসফোরাইলেশান প্রক্রিয়া সম্পাদন করে। ফলে ADP + Pi থেকে ATP তৈরী হয়।

৪. এনজাইম এর সহায়তায় আমিষ ও স্নেহজাতীয় খাদ্য তৈরী করতে সাহায্য করে।

৫.  সাইটোপ্লাজমীয় বংশগতি ধারায় এটি বংশগতীয় জিন DNA অণুতে বহন করে নিয়ে যায়।

৬. সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় ক্যালভিন চক্রের প্রয়োজনীয় এনজাইম সংশ্লেষণ করে।

৭. বংশানুসারে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের স্বকীয়তা ধারণ করে রাখে।

৮. ক্লোরোপ্লাস্টে ফটোরেস্পিরেশন ঘটে।

৯. ক্লোরোপ্লাস্ট প্রয়োজনে প্রোটিন, নিউক্লিক অ্যাসিড ইত্যাদি তৈরী করে।

১০. ক্লোরোপ্লাস্টে এর নিজস্ব কিছু DNA আছে যার সাহায্যে ক্লোরোপ্লাস্ট নিজের অনুরূপ সৃষ্টি ও কিছু প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরী করতে সক্ষম।

প্লাস্টিড কাকে বলে এইনিয়ে আলোচনা এই পর্যন্তই।

আশা করি আজকে আপনাদের প্লাস্টিড কাকে বলে , প্লাস্টিডের গঠন ও কাজ সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা দিতে পেরেছি।

আরও পড়ুন: সালোকসংশ্লেষণ কি?  সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার গুরুত্ব

আরও পড়ুন: টিস্যু বা কলা কি? টিস্যুর প্রকারভেদ ও প্রাথমিক ধারনা

About Sabekun Nahar

I am sabekun Nahar. I am a student of Biotechnology and Genetic Engineering. Content writing is my passion. I will try my level best for writing a content. Keep me in your prayers.

Check Also

ইউনিকোড কি

ইউনিকোড কি? এর বৈশিস্ট্য কি কি? আসকি (ASCII) এবং ইউনিকোড এর পার্থক্য কি?

ইউনিকোড আমরা যারা জানি না ইউনিকোড আসলে কি তাদের জন্যই আমার আজকের এই আয়োজন। আমাদের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *